সময় সমীকরণে নির্ভুল সত্তা তাজউদ্দীন আহমদ

সৌর শাইন

সময়ের চিরায়ত স্বভাব আপন স্রোতে বয়ে চলা, সুসময়-অসময়, সুদিন-দুর্দিন সবকালেই তাঁর গতি চির পরিচিত অশেষ পথের দিকে ধাবমান। সময় অনন্তধারা কিংবা অসীম সমীকরণের অস্তিত্ব প্রকাশ করে, সে সমীকরণে অজস্র রাশিমালার সমাবেশ। মানবসমাজের সর্বকালের প্রত্যেকটি মানুষই সময় সমীকরণের এক একটি চলক বা ধ্রুবক রাশি। সে রাশিগুলোর কোনোটি উজ্জ্বল কোনোটি অনুজ্জ্বল, কোনোটি অতি আলোকিত, কোনোটি উজ্জ্বলতায় নক্ষত্রেরও অধিক। পৃথিবীর আবহমান সময় সমীকরণে ঐ নক্ষত্রময় ধ্রুবক রাশিগুলো প্রকাশ করে আলোকিত মনীষীদের দ্যুতি, যাঁরা মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই নিয়েছেন পুণ্য ও আপন কর্মের মহিমায়।

বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনৈতিক মহলে আলোচিত ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের ইতিহাস পরিক্রমা ও এ দেশের সময় সমীকরণে একজন আলোকিত নক্ষত্রের নাম বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ। যিনি একজন মেধাবী রাষ্ট্রনায়ক, যাঁর নাম জড়িয়ে আছে এ দেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন গৌরবময় ইতিহাসে। একাত্তরের রণকাণ্ডারি তাজউদ্দীন আহমদের সাহসী ও দৃঢ় নেতৃত্ব এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এনে দিয়েছে চূড়ান্ত গতি। তিনি লক্ষ্যে ছিলেন অটল, অজস্র বাধা-বিপত্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁর নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছে আমাদের মহান বিজয়।
সময়ের মাপকাঠিতে অতীত পেরিয়ে আমরা নতুন শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে অবস্থান করলেও, আমাদের জাতীয় জীবনে তাজউদ্দীন আহমদের চিন্তা-চেতনা, রাজনৈতিক দর্শন, কর্মপ্রবাহ, রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিকল্পনা, ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা প্রভৃতি বিষয় আজও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর বক্তব্যগুলো যেন বর্তমান সময়ের কথাই বলছে, যেন এ সময়ের তরুণদের জন্যই তিনি স্বপ্ন বুনছেন, জনগণের মৌলিক চাহিদার পূরণের জন্য তাগিদ দিচ্ছেন, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য লক্ষ্যস্থির করছেন, বিপুল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনার কথা বলছেন, জনকল্যাণমুখী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের কথা বলছেন, আমজনতাকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আহ্বান জানাচ্ছেন, হতাশা নয় আশাকেই তিনি বার বার জাগ্রত করার কথা বলেছেন। যে সময়ের তাড়নায় তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর চিন্তা-চেতনা থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনা প্রকাশ করেছেন, আক্ষরিক অর্থে সে সময়টা আমরা পেরিয়ে এলেও বাস্তবিক অর্থে আমরা আজও সে পরিস্থিতির মধ্যেই আছি। আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা, বৈষম্যময় শিক্ষানীতি, পুঁজিবাদি শ্রেণির উত্থান, সম্পদের অসম বন্টন, অস্থিতিশীল রাজনীতি, ধর্মাশ্রয়ী গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রভৃতি বিষয় এখনো প্রধান সমস্যা রূপে আলোচিত।

রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যে যে সব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় তা হলো, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল সমাজ ভাবনা, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর্শন, আদর্শের কাছে আপোসহীন মনোভাব, আত্মসমালোচনায় বিশ্বাসী, আত্মপ্রচার বিমুখতা, সর্বোচ্চ ধৈর্য্যের পরিচয় দান, প্রখর বুদ্ধি-মেধা ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর প্রভৃতি। তাজউদ্দীন আহমদের এসব গুণাবলি যে কোনো দেশ বা সময়ের উপলব্ধি ক্ষমতা ও বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষকে অনায়াসে আকৃষ্ট করবে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সময়ের ক্ষেত্রে তাঁর এ গুণাবলি ও দিক-নির্দেশনা সমূহ আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে রাষ্ট্রজীবনে অনুকরণীয় হওয়া উচিত।

স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও, এদেশ এখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন করতে ও আপন লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা কিংবা তাজউদ্দীন আহমদের স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এর পেছনে প্রধান কারণ দুঃসময়ে বিশ্বাস ও দূরদর্শিতার ঘাটতি, বিভ্রান্ত রাজনীতি, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির উত্থান ও পঁচাত্তরের রক্তাক্ত ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, ও অন্যান্য নেতাদেরকে হত্যার মাধ্যমে এ দেশের উন্নয়নের গতিধারাকে ব্যাহত করা হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আমাদের উন্নত জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ করে বাঙালি জাতিকে পিছিয়ে দিয়েছে সীমাহীন সংকুল দূরত্বে। তাজউদ্দীন আহমদ আমাদের মধ্যে না থাকলেও তাঁর দেখানো পথ, চিন্তা-চেতনা, আদর্শ ও দিক-নির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশকে তৃতীয় বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য তাজউদ্দীন আহমদের দেখানো পথকেই অনুসরণ করতে হবে। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ও রাষ্ট্রনৈতিক বিষয়ে তাঁর আদর্শের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমার উপলব্ধি থেকে আলোচনা তুলে ধরা হল।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর বক্তব্যে এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির সংকটপূর্ণ পথ সম্পর্কে বলেছিলেন,”একটি কঠিন যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাধীনতার যুদ্ধ আরও কঠিন।” তাজউদ্দীন আহমদ বহুবার অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম আহ্বান করেছেন। সে জন্য প্রয়োজন সৎ আপোসহীন আদর্শবান ও দৃঢ় নেতৃত্ব। সে নেতৃত্বের সংকট আজও আমরা কাটিয়ে ওঠতে পারিনি।
তাজউদ্দীন আহমদের মতে, “অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন।”
তৃতীয় বিশ্বের নিম্নআয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আজও বিত্তশালী পুঁজিবাদী বিশ্বের কাছে পরাধীন। এ অর্থনৈতিক পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে উৎপাদনের প্রতি তাগিদ দিয়ে তিনি বলেছেন, “সমন্বিত ও সুশৃঙ্খল অর্থনৈতিক তৎপরতা উৎপাদনের জন্য আবশ্যক। উৎপাদন ও বণ্টন সমস্ত খাতকে অবশ্যই একযোগে এবং সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করতে হবে।”
যুদ্ধোত্তর দেশকে পুনর্গঠনে কঠোর পরিশ্রমের জন্য স্বেচ্ছায় প্রেরণা সৃষ্টির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “ঘুম পাড়ানিয়া গান আমাদের গাইলে চলবে না, যে গান আমাদের কঠোর পরিশ্রম করার জন্য জাগিয়ে রাখবে, সে গান আমাদের গাইতে হবে।”
দেশের অধিক জনসংখ্যার প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করে তাজউদ্দীন আহমদ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা এভাবে বলেন, “জনশক্তিকে সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলেই অর্থনৈতিক মুক্তি আনা সম্ভব।”
দেশে অপ্রতুল সম্পদে তিনি হতাশ না হয়ে জনশক্তি কেন্দ্রীক তাঁর উপলব্ধি প্রকাশ করেন, “আমাদের সম্পদ কম থাকলেও জনশক্তি আমাদের পর্যাপ্ত রয়েছে এই জনশক্তিকে কাজে না লাগালে, কঠোর পরিশ্রম না করালে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যে অর্জিত হবে না, তা আমরা উপলব্ধি করেছি।”

লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এ স্বাধীনতা। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো প্রসঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “যখন আমরা আমাদের প্রত্যেকটি নাগরিকের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা বিধান করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হব, তখনই আমরা শহীদদের প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা জানাতে পারব।”
এছাড়া তাজউদ্দীন আহমদ মৌলিক অধিকারকে বিপ্লবের সাথে যুক্ত করে বলেছেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য সঠিক শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র এবং বাসস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করতে না পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের বিপ্লব পূর্ণ হবে না।” সময় বয়ে গেলেও আমরা আজও সে লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হইনি। মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বার বার হেরে যেতে হয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির কাছে।

স্বদেশ গড়ে তোলার জন্য তাজউদ্দীন আহমদ ছাত্র ও তারুণ্য শক্তির প্রতি ছিলেন সবচেয়ে বেশি আশাবাদী। ওদের সঠিক ও সুন্দরভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বার বার। তরুণদের বেড়ে ওঠা প্রসঙ্গে বলেন, “তরুণদের শারীরিক উৎকর্ষতা সাধনের জন্য খেলাধূলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।”
তিনি তরুণদের সঠিক পথে পরিচালনার জন্য বলেন, “শিক্ষায়তনের বাইরে খেলাধূলা ও পড়াশোনার সুযোগ নেই বলে তরুণ সমাজ বিপথে যাচ্ছে। জাতি ও সমাজ গঠনে তরুণ সমাজকে নিয়োজিত করতে হলে তাদের অভাব অভিযোগ দূর করে তাদের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।”
তরুণরা যাতে কোনো ক্রমে পথভ্রষ্ট না হয় সেদিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “তরুণ সমাজ অদম্য শক্তির অধিকারী, এই শক্তিকে যদি সুষ্ঠু পথে পরিচালনা করা না যায়, তা হলে সেই শক্তিটা যদি বিপথে যায় বা উদ্দেশ্যহীন, লক্ষ্যহীন হয়ে যায় তবে অবস্থা মারাত্বক হয়ে দাঁড়াবে।”
নতুন সমাজ গড়ে তোলার তাগিদ দিয়ে ছাত্রদের প্রতি তিনি বলেন, “বর্তমান সমাজকে পরিবর্তন করে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার প্রয়োজন কেন, তা ছাত্রদের জানতে হবে। বর্তমান সমাজের পরিবর্তন সাধনের প্রয়োজন সুষ্ঠুভাবে উপলব্ধি করতে পারলেই নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার পথেরও সন্ধান পাওয়া যাবে।”
তিনি দেশ ও সমাজ গড়ার জন্য সকলের প্রতি আদর্শে পাঠ নেবার কথা বলেন। তিনি বলেছেন, “সমাজকে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব বহনের জন্য আদর্শবাদের দীক্ষায় দীক্ষিত হতে হবে।”
লেখাপড়ার প্রতি জোর দিয়ে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন, “ছাত্র সমাজকে পরস্পরের মতের প্রতি সহনশীল ও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। ছাত্রদের রাজনীতির পাশাপাশি লেখাপড়াও ঠিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে। ছাত্রদের মনে রাখতে হবে তাদের প্রাথমিক এবং প্রধান কর্তব্য হল লেখাপড়া করা।”
তাজউদ্দীন আহমদ ছাত্রাবস্থা থেকে রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেছেন। একজন আদর্শ ছাত্রের সবরকম গুণাবলি তাঁর ডায়েরিতে পাওয়া যায়। তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর জীবনের সাথে মিল রেখে ছাত্রলীগের রাজনীতি প্রসঙ্গে বলেন, “ছাত্রলীগের আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করতে হলে চরিত্রবান ও আদর্শবান হতে হবে। ছাত্রদের শৈশব থেকে মহৎ গুণ অনুশীলনের জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে। ছাত্ররাই ভবিষ্যতের নেতা ও রাষ্ট্রনায়ক। দেশ ও সমাজকে সুখী করতে হলে নিজেদের চরিত্রকে নিষ্কলুষ রাখতে হবে।”
শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবহারিক শিক্ষার গুরুত্ব আরোপ করে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “ছাত্রদের পুঁথিগত শিক্ষার চাইতে ব্যবহারিক শিক্ষাদানের ওপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে সুস্পষ্ট ফল লাভ করা না গেলে জ্ঞান অর্থহীন হয়ে পড়বে।”
বাংলাদেশে অধিক বেকারত্বের পেছনে একটি প্রধান কারণ, গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। ঢালাও ভাবে একমুখী শিক্ষাগ্রহণ, সনদ অর্জন, শিক্ষিত বেকারত্বের হার বৃদ্ধি কখনোই রাষ্ট্রের জন্য ফলপ্রসূ হতে পারে না। আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা, যা আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠান ভেদে উঁচু-নিচু মান বিবেচনা করা হয়, যা শিক্ষার প্রকৃত মান যাচাইয়ে সৃষ্টি করেছে ব্যাপক বৈষম্য, যা বর্তমান সময়ে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীর হতাশা ব্যঞ্জক ভবিষ্যতের জন্য দায়ী।
তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, “নতুন সমাজ গড়ার জন্য শিক্ষা বৃত্তিমূলক হওয়া প্রয়োজন এবং কতজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার দরকার তা জরিপ করে শিক্ষা দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থার শিক্ষা পদ্ধতির বৈষম্য দূর করার প্রচেষ্টা নিতে হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।”
পরিকল্পিত ও জনকল্যাণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার উপর জোর তাজউদ্দীন আহমদ আরও বলেন, “গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা আমি চাই না। জনকল্যাণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চাই। যে শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের অগ্রগতির প্রতিটি স্তরে প্রয়োজনীয়সংখ্যক অনুশীলনপ্রাপ্ত কর্মীর যোগান দেবে সে ব্যবস্থাই আমার কাম্য। পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা চাই। যেখানে দেশের অগ্রগতির সর্বস্তরের সবরকম কর্মী পাওয়া যাবে। কোনও দিক শূন্য থাকবে না।” তাজউদ্দীন আহমদের এ দিক-নির্দেশনা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। আমাদের বর্তমান সময়ের জিপিএ ফাইভমুখী শিক্ষা ব্যবস্থাকে অতি শীঘ্রই বৃত্তিমূলক ও সুপরিকল্পিত শিক্ষানীতির আওতায় নেয়া উচিত।

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক সত্তা বরাবরই বুদ্ধি বিবেচনা সম্পন্ন মানুষকে মুগ্ধ করে। রাজনীতিবিদ তাজউদ্দীন আহমদ গড়ে ওঠেন প্রগতিশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শনকে কেন্দ্র করে। তিনি তীব্রভাবে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন, যা তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থা থেকেই চর্চা করেছেন। সে সম্পর্কে তাঁর ডায়েরিতে চমৎকার বর্ণনা রয়েছে। ১৯৫১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, হল ছাত্রদের বার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। সে নির্বাচনে তাজউদ্দীন আহমদ সমর্থিত স্টুডেন্ট ইউনিটি বিগ্রেড ও ইউনাইটেড ডেমোক্রেটসের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। নির্বাচনে জয়-পরাজয় দাঁড়ায় সমান-সমান। ফলে উভয় দলের পাঁচজন-পাঁচজন সদস্য নিয়ে কমিটি নির্বাচিত হয়। তাজউদ্দীন আহমদ নব-নির্বাচিতদের সঙ্গে নিয়ে হলের প্রতিটি রুমে পরিচয় করিয়ে দেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর বক্তব্যে গণতন্ত্রের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “গণতন্ত্রে প্রত্যেকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে এবং এ ক্ষেত্রে মতামতের বিভিন্নতাও একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এই পার্থক্য আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও লক্ষ্য বিরোধী হলে চলবে না। জাতীয় প্রশ্নে আমাদের মধ্যে দলমত নির্বিশেষে একটা অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত।”
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের গুরুত্ব ও বিরোধী দলের সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা প্রসঙ্গে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলই বিকল্প সরকার। বিরোধী দলগুলোকে এমন হতে হবে যেন তারা জনগণের পূর্ণ আস্থা লাভ করতে পারে পারে। তা না হলে দেশের জনগণ হতাশার শিকার হবে। বাংলাদেশের জনগণকে নৈরাজ্যের শিকারে পরিণত করার অধিকার কোন বিরোধী দলেরই নেই।”
তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব, যা সোভিয়েট রাশিয়া কিংবা চীনের ধরনে হবে না, বরঞ্চ তা হবে আমাদের নিজেদের মতো। আমরা গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যে একটি সুষম সমন্বয় ঘটাব, যা বিশ্বে একটি অসাধারণ ব্যাপার হবে।”
গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য পরস্পরের প্রতি প্রতিশ্রুতি, প্রতিজ্ঞা ও প্রত্যয় আহ্বান করে তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, “বাংলাদেশের নিরন্ন দুঃখী মানুষের জন্য রচিত হোক এক নতুন পৃথিবী, যেখানে মানুষ মানুষকে শোষণ করবে না। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক ক্ষুধা, রোগ, বেকারত্ব আর অজ্ঞানতার অভিশাপ থেকে মুক্তি। এই পবিত্র দায়িত্বে নিয়োজিত হোক সাড়ে সাত কোটি বীর বাঙালি ভাইবোনের সম্মিলিত মনোবল ও অসীম শক্তি। যাঁরা আজ রক্ত দিয়ে উর্বর করেছে বাংলাদেশের মাটি, যেখানে উৎকর্ষিত হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন মানুষ, তাঁদের রক্ত আর ঘামে ভেজা মাটি থেকে গড়ে উঠুক নতুন গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ; গণ-মানুষের কল্যাণে সাম্য আর সুবিচারের ভিত্তিপ্রস্তরে লেখা হোক ‘জয় বাংলা’ ‘জয় স্বাধীন বাংলাদেশ’।
আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্পষ্ট দেখতে পাই রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ, ক্ষমতালোভী, হিংসাত্বক আচরণকে কেন্দ্র করে সময় পাড় করছে। রাষ্ট্রীয় বা দলীয় আদর্শ এখানে গৌণ রূপধারণ করেছে, ব্যক্তি কেন্দ্রীক স্তুতিবাদ, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি প্রভৃতি সুষ্ঠু গণতন্ত্রের পথকে ব্যাহত করছে। এ ক্ষেত্রে আলোর পথ হতে পারে তাজউদ্দীন আহমদের গণতান্ত্রিক আহ্বান, যা হতে পারে পৃথিবীর প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অনুকরণীয়।

তাজউদ্দীন আহমদ সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর ডায়েরিতে সেরূপ বহু আলোচনা পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও তাজউদ্দীন আহমদের স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলা। সে সম্পর্কে তিনি বলেন, “ধর্মের ওপর ভিত্তি করে দেশে কোনো রাজনৈতিক দল থাকবে না। অর্থনৈতিক ও গঠনমূলক কর্মসূচির উপর ভিত্তিশীল রাজনৈতিক দলগুলোকেই শুধু এখানে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হবে। বাংলাদেশ হবে একটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। বাংলাদেশে প্রতিটি ধর্মের জন্য পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। রাষ্ট্র কোনো ধর্মের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। ধর্মের নামে কাউকে শোষণ করতে দেওয়া হবে না। ধর্মীয়ভিত্তিতে কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থাকবে না। দেশের সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত দলই শুধু সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচিত হবে।”

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন বিভাগের স্বাধীনতা থাকা আবশ্যক। আইন বিভাগ প্রশাসনের প্রভাব মুক্ত না হলে একটি বড় সংকট সবসময়ই বিরাজমান থাকে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও আইনের প্রতি আনুগত্য থাকার আহ্বান জানিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “দেশ গড়ার জন্য একটি আইনের শাসন চাই। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রত্যেককে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। বক্তৃতা কমাতে হবে। এখন ভেবে দেখতে হবে বক্তৃতায় যা বলা হয়েছে, তা করা হয়েছে কি না।”

দুর্নীতি আমাদের দেশ ও সমাজের একটি বড় ব্যাধি, যা সর্বত্র উন্নয়নের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীত থেকে বর্তমান সময় অবধি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ দুর্নীতির কালো ফণার আঘাতে জর্জরিত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাজউদ্দীন আহমদ সর্বদাই সোচ্চার ছিলেন। রাজনীতিবিদদের তিনি বার বার আহ্বান জানিয়েছেন জনগণকে সাথে নিয়ে দুর্নীতিবাজদের মোকাবেলা করার জন্য। তিনি দুর্নীতিগ্রস্থ নেতৃত্বকে বয়কট করার ডাক দিয়ে বলেন, “জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে দুর্নীতিপরায়ণ নেতৃত্বের কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে হবে।”
তিনি আরও বলেছেন, “স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় থেকে যে বিপ্লবের শুরু হয়েছে সেই বিপ্লবের গতিকে থামিয়ে দিলে চলবে না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিপ্লবের সেই গতিকে পরিচালিত করতে হবে। তবে তার জন্য পুরানো মানসিকতা ত্যাগ না করলে বিপ্লবের লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হবে না। আমাদের কর্মপ্রবাহে যে ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও দুর্নীতি রয়েছে তা কঠোর হাতে দমন করতে হবে।”

যারা দেশ ও সমাজের ক্ষতি করবে তাদের তিনি দুষ্কৃতিকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, “দুষ্কৃতিকারীর একমাত্র পরিচয় সে দুষ্কৃতিকারী। সে যে দলেরই হোক। আমরা অনেক সময় এটা বিরোধী দলের ওপর চাপিয়ে দেই। এতে দুটো সর্বনাশ হয়। সে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে যায়। রাজনৈতিক স্লোগান তার পক্ষে যাবার একটা সম্ভাবনা দেখা দেয়। এবং সে যতটা শক্তিশালী নয় কিন্তু জনগণের সামনে শক্তিশালী প্রমাণ হয়।”
দেশ ও সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেবার ডাক দেন। রাজনৈতিক মহলে দুর্বৃত্তদের ঠাঁই না দেবার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “দুর্বৃত্ত দুর্বৃত্তই, সে যে পদের অধিকারী হোক না কেন। যদি তাজউদ্দীনও কোনো প্রতারণা করে অথবা নক্সালি কোনো ডাকাতিতে জড়িত হয়, তবে তাদের রাজনীতিক না বলে দুর্বৃত্ত বলেই আখ্যা দিতে হবে। দুষ্কৃতিকারী ও সমাজবিরোধী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তাকে রাজনৈতিক রূপ যেন না দেয়া হয়। রাজনৈতিক রূপ দিলে সে আশ্রয় পেয়ে যায়। দুষ্কৃতিকারী রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী নয়। দুষ্কৃতিকারী সে যেই হোক তাকে ক্ষমা করা চলবে না।”
গণতন্ত্রে সহনশীলতার উদাহরণ টেনে তাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, “গণতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে সহনশীলতা। এর অভাবে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোরই ক্ষতি হবে না, খোদ রাষ্ট্রের স্বার্থও বিঘ্নিত হয়। রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির পথ পরিহার করে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী এই উভয়পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীলতার অনুশীলন শিক্ষার প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে ঊর্ধ্বে রেখে পারস্পরিক মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।”
তাজউদ্দীন আহমদের এসব বক্তব্যের সাথে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আজও সুসম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি। সরকারি দল ও বিরোধী দল পরস্পরের বিরুদ্ধে সর্বদাই বিরূপ আচরণে ব্যস্ত থাকে। সন্ত্রাসী, অপরাধীকে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে যা অপরাধীর জন্য চমৎকার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। আমাদের রাষ্ট্রের কল্যাণে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন। পৃথিবীর বুকে সভ্য দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের জন্য তাজউদ্দীন আহমদসহ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নেতৃত্বের আদর্শকে বাস্তবায়ন আবশ্যক।

তাজউদ্দীন আহমদ বার বার এ দেশের মানুষকে পুরানো মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। গণতন্ত্রে দেশ ও সমাজ সুষ্ঠুভাবে গড়ে তোলার জন্য সুষ্ঠু মানসিকতার বিকল্প নেই।
তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “আমরা সামন্তবাদী অবস্থা ও পরিবেশ থেকে এখনও পূর্ণ গণতান্ত্রিক অবস্থায় পৌঁছতে পারিনি। সামন্ত প্রভু আজ নেই সত্য- কিন্তু সামন্ত মনোবৃত্তি এখনও রয়েছে। আগে এই মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।”
কর্তব্যপরায়ণ মানসিকতার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “নতুন মানসিকতা ছাড়া দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। নিজেদের কর্তব্য নিজেরা পালন করলেই জাতীয় কর্তব্য করা হবে।”
বর্তমান সময়েও দেখতে পাই আমাদের দেশের মানুষদের প্রধান বৈশিষ্ট্য আপন স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া। প্রতিটি স্তরে অনৈক্য ও স্বার্থবাদী মনোভাব বিদ্যমান। এ মানসিকতা থেকে আমাদের সরে না এলে ভবিষ্যত কখনোই অনুকূলে আসবে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ কর্তব্যে সচেষ্ট থাকা উচিত, যা সম্ভব হলে রাষ্ট্রীয় ঐক্যের রূপ চমৎকারভাবে পাল্টে যেতে পারে।

আমাদের জাতীয় জীবনে একটি ক্ষেত্রে আমরা বার বার হোঁচট খেয়েছি তা হল ইতিহাস। এটি আমাদের রাষ্ট্রের জন্য অনুতাপ ও হাতাশাজনক দিক। ক্ষমতাসীনদের হস্তক্ষেপে বার বার ইতিহাস বিকৃত হওয়ার কারণে আমরা যেমন বিভ্রান্ত, তেমনি আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের প্রতি বহির্বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিকে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা ইতিহাসকে নিজেদের দাস বানানোর পায়তারা হিসেবে ইচ্ছে মত, খণ্ডিত ও বিকৃত আকারে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে প্রকাশ করে ও ব্যবহার করে। যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হতাশাব্যঞ্জক।

আত্মপ্রচার বিমুখ তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নিজেকে জনগণের কাতারে রেখে স্বাধীনতার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলেন, “বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জনগণই সৃষ্টি করেছে। একা কেউ এ ইতিহাস সৃষ্টি করেনি। এই ইতিহাসকে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে।”
সঠিক ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করার স্বার্থে তিনি ঐতিহাসিকদের স্ব স্ব অবস্থান থেকে দেখা ইতিহাসকে নির্ভুলভাবে উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “ঐতিহাসিক ঘটনাবলীকে ধরে রাখার জন্যে দেশের ঐতিহাসিকদের কাজ করতে হবে। যিনি যেভাবে ঘটনাবলীকে দেখেছেন, ঠিক সেভাবেই ঘটনাকে তুলে ধরতে হবে। ঘটনার গভীরে যেতে হবে এবং ঘটনার সঠিক ও নির্ভুল ব্যাখ্যা থাকতে হবে।”
ঐ সময় তাজউদ্দীন আহমদ বার বার ইতিহাস সংরক্ষণের কথা বলেছেন, সরাসরি ইতিহাস রচনার কথা বলেননি। কারণ সত্য বড় নির্মম যা সময়ের ধারাবাহিকতায় আঘাতপ্রাপ্ত হবার সম্ভাবনাকে জাগ্রত করতে পারে। তাই তিনি সুচিন্তিতভাবে বলেন, “সমকালীন ইতিহাস রচনা ও তা প্রকাশ করা খুবই কঠিন। কারণ তাতে জীবিত ব্যক্তিদের সংঘর্ষ হতে পারে। এতে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় স্বার্থে মিথ্যা কথা বলব না, সত্য গোপন করতে পারি।”
ইতিহাস কেন্দ্রীক তাজউদ্দীন আহমদের এ বক্তব্য ও দিক নির্দেশনা সমূহ ইতিহাস গবেষকদের জন্য বিশেষ ইঙ্গিতপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দল ও ব্যক্তি স্বার্থে রচিত মিথ্যা ইতিহাসের ইতিহাস কী পরিণতি হতে পারে সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে সঠিক তথ্য ও উপকরণ সংগ্রহ করে এর ইতিহাস রচনা করতে হবে। মিথ্যা ও কল্পনার রঙে রঞ্জিত কোনো ইতিহাস যদি রচনা করা হয় তবে তা নিশ্চিতভাবে আগামীতে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে।”
ইতিহাসের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে তাজউদ্দীন আহমদ দেশ গড়ার দায়িত্ব সম্পর্কে বলেন, “আত্মত্যাগের মাধ্যমে শহীদ ভাইয়েরা দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন। এখন দেশকে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের। আমরা যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই, তবে আমাদেরকে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে স্থান নিতে হবে।” তাজউদ্দীন আহমদের এ বাক্যগুলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ইতিহাস গবেষকদের নিঃসন্দেহে দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সর্বোপরি একজন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব। সংস্কৃতি প্রেমিক হিসেবে তাঁর ডায়েরিতে অহরহ ঘটনার প্রমাণ ও স্বাক্ষর রয়েছে।
বিশ্বজনীন সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী তাজউদ্দীন আহমদ সংস্কৃতির এক অবিস্মরণীয় সংজ্ঞা প্রদান করে বলেন, “সংস্কৃতির আবেদন বিশ্বজনীন। এর সীমারেখা টানা ঠিক হবে না। সংস্কৃতি চির প্রবাহমান। সত্য ও সুন্দরের সাধনাই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি কোনকালে কোন অবস্থায়ই বর্জনীয় নয়, সবকালেই গ্রহণীয়।”
দেশ স্বাধীন হবার পর তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনের উদ্দেশ্যে দিক-নির্দেশনা দিয়ে বলেন, “ইতিহাসে এই প্রথম বাঙালিদের আবাসভূমি হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনে আমাদের চেষ্টা করা উচিত। আমাদের সাহিত্য, চিত্রকলা ও লোক কাহিনীর যে সব উপাদান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে; সেগুলো একত্রিত করে সংস্কৃতির ইতিহাস আবার নতুন করে সৃষ্টি করা যায়। সে জন্য এ কাজে বিভিন্ন স্তরের চিন্তাধারার মিশ্রণ ঘটিয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।”
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুষ্ঠুধারার সাহিত্য সংস্কৃতি উপহার রেখে যাওয়ার জন্য তাজউদ্দীন আহমদ সবার উদ্দেশ্যে বলেন, “অতীতে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখন আমাদের দেশ স্বাধীন। এখন আমাদেরকে নিজেদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতার এমন একটি উন্নত ঐতিহ্য উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যেতে হবে যা ভবিষ্যত বংশধরদেরকে প্রেরণা যোগাবে এবং যার ফলে ভবিষ্যৎ বংশধর গর্ব অনুভব করতে পারেন।”
এ দেশের ইতিহাস সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য তিনি বলেন, “দেশের ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য আরও জাদুঘর ও গ্যালারি এবং গ্রন্থাগার প্রয়োজন।”
তাজউদ্দীন আহমদের সাহিত্য সংস্কৃতি ও সভ্যতা নির্মাণের এ স্বপ্নও ঘাতকদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। যা বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের উপলব্ধির বিষয়, তবে তাঁর স্বপ্ন ও নির্দেশনা প্রতিটি সময়ের প্রজন্মকে দারুণভাবে আলোড়িত করবে, প্রেরণা যোগাবে সত্য ও সুন্দরের সাধনাকে বাস্তবায়নের।

তাজউদ্দীন আহমদের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ সময় ছিল ১৯৭১, যখন তাঁর অর্পিত হয়েছিল কোটি বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব। সে সময়ে তাঁর অপরিসীম সাহসিকতাপূর্ণ নেতৃত্ব বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রজন্মকে রোমাঞ্চিতভাবে আকৃষ্ট করবে। অজস্র বাধা-বিপত্তী থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন নির্ভিক নাবিক। স্লোগান-মঞ্চের বক্তৃতা থেকে সতর্ক থাকা আত্মপ্রচার বিমুখ এ মানুষটি বরাবরই দলের অভ্যন্তরে সাংগঠনিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পছন্দ করতেন। কিন্তু একাত্তরের ক্রান্তিকাল তাঁকে টেনে দাঁড় করিয়েছে সকলের সম্মূখে রাষ্ট্রনায়ক রূপে। তিনি ঐ ঐতিহাসিক সময়ে যুদ্ধদিনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ সম্পর্কে স্মৃতিচারণে বলেন, “আমি ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে দেশের মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনায় যে সব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা বাংলাদেশ ও এ দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বার্থেই নিয়েছিলাম। বাঙালির আশা আকাঙ্ক্ষা আর বাঁচা-মরার প্রশ্নকে সেদিন সবচেয়ে উঁচুতে স্থান দিয়েই আমি কাজ করে গিয়েছি। আওয়ামী লীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে এবং একজন খাঁটি বাঙালি হিসেবে আমার দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে পালন করতে পারায় আমি খুশি।”

তিনি তাঁর উপর যুদ্ধদিনের দুঃসময়ের অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে আরও বলেন, “আগে কখনো ভাবিনি যে, আমার মতো সাধারণ কর্মীর ওপর জাতির ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব পড়বে। দেশবাসীও সম্ভবত তা পূর্বে কখনো ভাবেনি। আসলে নেতৃত্ব হচ্ছে জনগণের মনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। ধনতন্ত্রের পথে কিংবা কোনো যুদ্ধ জোটে যাব না- এই মনোভাব নিয়েই ১৯৭১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করি। স্বাধীনতা সংগ্রামে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি বিরাট পদক্ষেপ।”

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পৃথিবীর প্রতিটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতি এ দেশের মানুষের ন্যায্য স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সমর্থনের জন্য আহ্বান জানানো হয়। সে ক্ষেত্রে তৎকালীন বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ও বিপক্ষে দুটো শক্তির স্পষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে ছিল ব্যাপক ষড়যন্ত্রের জাল, পাকিস্তানের বন্ধু-সজ্জন পরিচিত তৎকালীন চীন ও মার্কিন সরকারের বিরোধীতা, বাঙালি মুসলমানদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের অপপ্রচার, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কিত বিরূপ মনোভাব প্রভৃতি। এছাড়া মার্কিন সরকার বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে প্রবেশের নানা ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায় ও ষড়যন্ত্রের কূটচাল অব্যাহত রাখে।
১৯৭১ সালে বহির্বিশ্বের সাথে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক যুদ্ধ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “১৯৭১ সালে আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন যুদ্ধ করতে হয়েছিল, তেমনি কূটনৈতিক ফ্রন্টেও যুদ্ধ করতে হয়েছিল। আমাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শেষ করার লক্ষ্য ছিল নভেম্বর মাস। কেননা, আমি জানতাম, বাংলাদেশে বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানি বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের পরাস্ত করতে না পারলে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ সফলকাম হবে না এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাও আসবে না। এছাড়া আরও বুঝেছিলাম যে, ওই সময়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে না যাওয়া হলে মার্কিনীরা তার সুযোগ নেবে এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধকে নিয়ে আসবে বাংলার মাটিতে। কেননা, আমেরিকাকে ভিয়েতনাম থেকে সরতেই হবে। আর এ সম্পর্কে আমরা খুবই হুঁশিয়ার ছিলাম।”
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ব্যাহত করতে পাকিস্তানের মিত্র আমেরিকা প্রথম থেকেই ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। ভারতে যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে খন্দকার মুশতাককে প্রভাবিত করে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করা হয়। মার্কিন সরকারের সে ষড়যন্ত্রকে তাজউদ্দীন আহমদ পররাষ্ট্র মন্ত্রী খন্দকার মুশতাককে মন্ত্রণালয়কে সরিয়ে কঠোর হাতে মোকাবেলা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “পাকিস্তান তার বন্ধুদের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির বহু চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সফল হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারও আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ধ্বংস করার জন্য বহুভাবে চেষ্টা করে। সংগ্রামের এক পর্যায়ে আমেরিকা প্রশ্ন তোলে-‘স্বাধীনতা চাও না মুজিবকে চাও’। এর উত্তরের আমি বলেছিলাম, ‘স্বাধীনতাও চাই, মুজিবকেও চাই। স্বাধীনতা এলেই মুজিবকে পেতে পারি’। কারণ, আমি জানতাম, আদর্শের মধ্যে শেখ মুজিবকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলেই স্বাধীনতা সংগ্রাম জোরদার হবে। আর এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর সাথে ২৭ বছর রাজনীতি করেছি, আমি তাঁকে গভীরভাবে জানি।”
তাজউদ্দীন আহমদের এ উপলব্ধি সময়ের নানা দিক থেকে গবেষণার দাবি রাখে। মার্কিনপন্থী নেতা খন্দকার মুশতাকের কূটচালের প্রতিউত্তরে বঙ্গবন্ধু ও স্বদেশ দুটোই তিনি চেয়েছেন বলিষ্ঠ কণ্ঠে।
তাজউদ্দীন আহমদ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সর্বদাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। ভারতের মাটিতে আশ্রিত হয়েও তিনি ভারত সরকারের সাথে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ে কখনো কোনো আপোস করেননি। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত মিত্রবাহিনী সম্পর্কে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “বাংলাদেশে কারোর ঘাঁটি হবে না। এমন কি যুদ্ধের দিনে সবচেয়ে বিপর্যয়ের সময়ে, ভারতীয় বাহিনীকে বলেছি, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছি, বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে তুমি আমার দেশে যাবে। বন্ধু তখনি হবে, যখন তুমি আমাদের স্বীকৃতি দেবে। তার আগে সার্বভৌমত্বের বন্ধুত্ব হয় না। ৬ ডিসেম্বর স্বীকৃতি দিয়ে ভারতীয় বাহিনী আমাদের সাথে এসেছিল। শুনে রাখুন আমার বন্ধুরা, তখন কোনো গোপন চুক্তি ভারতের সাথে হয় নাই। একটাই চুক্তি হয়েছে, সেই চুক্তি প্রকাশ্য এবং কিছুটা লিখিত কিছুটা অলিখিত। সেই নয় মাসে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আমি যুক্তভাবে সই করেছিলাম। সেখানে লেখা ছিল আমাদের স্বীকৃতি দিয়ে সহায়ক বাহিনী, supporting force- হিসেবে তোমরা আমাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। এবং যেদিন আমরা মনে করব আমাদের দেশে আর তোমাদের থাকার দরকার নাই, সেদিন তোমরা চলে যাবে। সেই চুক্তি অনুসারে যেদিন বঙ্গবন্ধু শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে বললেন, ৩০ শে মার্চের মধ্যে তোমাদের বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে যাবে, তখনই মিসেস গান্ধী ১৯৭২ এর ১৫ মার্চের মধ্যে সহায়ক বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে গেলেন।”
তাজউদ্দীন আহমদের এ সাহসিকতার দৃষ্টান্ত আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি বড় প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। যাঁদের দ্বারা এ দেশে একদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হবে।

বর্তমান ও ভবিষ্যত সময়েও তাজউদ্দীন আহমদকে চর্চা করা আমাদের কেন প্রয়োজন?
এ প্রশ্নটির উত্তর খোঁজের পাবার জন্য আমাদের অবলোকন করতে হবে বর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিকূল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে, সেখান থেকে আমাদের সুষ্ঠুভাবে উত্তরণের পথ খোঁজে বের করতে হবে। তাজউদ্দীন আহমদ সর্বোপরি একজন নির্ভুল সত্তার নাম, যিনি ভুল করেও কখনো ভুল করেননি। তাঁর দিক-নির্দেশনা, চিন্তা-চেতনা অতীত ও বর্তমান সময়কে ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের সাথেও সামঞ্জসপূর্ণ। তাই সময়ের স্বার্থে রাষ্ট্রের স্বার্থে এই রাষ্ট্রনায়কের মৌলিক কর্মপ্রবাহ-রাজনৈতিক দর্শন চর্চা ও গবেষণার দাবি রাখে, যা আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ তাজউদ্দীন আহমদের প্রয়োজনীয়তা প্রকৃতপক্ষে কখনোই ফুরাবে না। সময় সমীকরণ যতই সম্মূখে ধাবিত হবে ততই তাঁর কর্ম ও আদর্শের আলোক রশ্মি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠবে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জীঃ
১) ইতিহাসের পাতা থেকে তাজউদ্দীন আহমদ, প্রতিভাস প্রকাশনী।
২) তাজউদ্দীন আহমদের আলোকভাবনা উদ্ধৃতি সংকলন, প্রতিভাস প্রকাশনী।
৩) তাজউদ্দীন আহমদের সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনা নির্বাচিত বক্তৃতা, প্রতিভাস প্রকাশনী।
৪) তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি (১ম থেকে ৪র্থ খণ্ড), প্রতিভাস প্রকাশনী।

sydney night

thepubtheatre

pafibulelengkab.org

piala dunia

Scroll to Top