মুসলিম পরিবারে জন্মের সুবাদে প্রথম শ্রবণেই ইসলামের বাণী শোনাটা যেমন অপরিহার্য ছিল, মুক্তিযুদ্ধের কট্টর সপক্ষ ঘরে জন্মাবার কারণে পাকিস্তান ও তার এদেশীয় দোসরদের অত্যাচার, এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংক্রান্ত আলোকপাত শোনার সুযোগ হয়েছে শৈশবের প্রায় নিত্যসন্ধ্যায়। বাড়ীর আঙিনায় সবগুলো ভাইবোন একত্রে বসে বাবার কণ্ঠে দেশাত্মবোধক গানের তালে তাল বাজানো এবং গান শেষে বাবার মুখে মানবিক গুণাবলির গল্প আর বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে আলোকপাত না শুনে কাটাতে পারিনি একটি সন্ধ্যাও। ব্যাপারটা এতই তীব্র ছিল যে, বাড়িতে নিযুক্ত লজিং মাস্টার শ্রদ্ধেয় হিমু স্যারও আমাদেরকে পড়তে বসানোর সাহস করতেন না, বরং নিজেই কখনও কখনও বসে যেতেন আমাদের আসরে। উল্লেখ্য, হিমু স্যার আমার বাবার ছাত্র ছিলেন।
সূর্যের আলো ছাড়া যেমন দিনের প্রকৃত রূপ ব্যাখ্যা করা যায় না, তেমনি বাবাও পারেননি “বঙ্গবন্ধু” আর “বঙ্গতাজ” শব্দ ২টিকে এড়িয়ে গিয়ে আমাদের কাছে বাংলাদেশকে ফুটিয়ে তুলতে। সেই থেকে গোটা পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মানসপটে স্থান করে নিয়েছে কালজয়ী কিছু বৈপ্লবিক নামঃ বঙ্গবন্ধু, বঙ্গতাজ, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ।
পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়ার পরেই শুরু হয় পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ এবং সেখানকার হোস্টেল কিংবা মেস ভিত্তিক জীবন যাপন। সেই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত বঙ্গতাজকে নিয়ে কোথাও কোন আলোচনা শুনেছি কিংবা পাঠ্যবইতে বিশেষ কিছু পড়েছি বলে একদমই মনে পড়েনা। মিথ্যার অনুকূলে তরুন প্রজন্মের মগজ ধোলাই করাটাই হয়ত এর প্রধান কারণ ছিল। পাকিস্তানপন্থিরা স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃত করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। অন্তত তাজউদ্দীন আহমদ এর ব্যাপারে খোদ বাংলাদেশপন্থিরাও সম্ভবত পর্যাপ্ত যথার্থ ভূমিকা পালন করেনি, তাই হয়তো শুনিনি। যাইহোক এখানকার আলোচ্য বিষয় সেটা নয়। ধন্যবাদ প্রিয় বিভাগ শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়নকে। এই বিভাগের অধীনে প্রতি বছর আয়োজিত “তাজউদ্দীন আহমদ স্মারক বক্তৃতা” এবং প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থের মাধ্যমেই মূলত শুরু হয় সচেতন প্রক্রিয়ায় বঙ্গতাজকে জানার, যা চূড়ান্ত রূপ পায় ৮ নভেম্বর ২০১৮। সেদিনের স্মারকবক্তা বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন স্যারের আলোচনা শুনছিলাম মন্ত্রমুগ্ধের ন্যয়। ‘বঙ্গতাজ ছিলেন একজন হাফিজে কুরআন, তিনি ছিলেন সদা স্বনির্ভর ও কর্মঠ এক আত্মপ্রত্যয়ী যুবক, কখনোই আড্ডা দিতেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠীদের তুলনায় বয়সে একটু বড়, কৃষক পরিবারের সন্তান, বাবার মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন অনুপস্থিত’, স্যারের মুখে এজাতীয় কিছু বাক্য শোনামাত্রই বঙ্গতাজের সাথে নিজের একটা দারুন সাদৃশ্য ও প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পেলাম। শোনার এবং জানার আগ্রহটা বেড়ে গেল বহু থেকে বহু গুন।
আমার সাংগঠনিক মনোভাবটা আজন্ম। ‘সমাজবিমুখতায় প্রাণ থাকতেও আত্মার মৃত্যু হয়’, সেই বোধ থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিসরে হলেও কোন একটা ইতিবাচক প্লাটফর্মে থেকে সাধারণ্যে একীভূত থাকার নেশাটা ছোটবেলা থেকেই এত তীব্র যে, এর ব্যত্তয় ঘটানোর শক্তি বা ইচ্ছা কোনটাই জাগেনি, কখনও। সম্ভবত একারণেই স্যারের মুখে তরুন তাজউদ্দীনের রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার গল্পটা আমার জীবন ও কর্ম, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে এতটাই প্রাসঙ্গিক ছিল যে, সিনেট ভবনের সেই বিবশ গ্যালারিতে সবার অজান্তেই একটি আসনে চলছিলো প্রাণের স্পন্দন। ঐদিনই প্রথম উপলব্ধি করলাম, আমার স্বপ্নটা মহৎ আর তা পূরণের স্পৃহাটা অদম্য হলেও রাস্তাটা যথেষ্টই অজানা। আজ সেই অজানা পথের সন্ধান দিচ্ছে তাজউদ্দীনের গল্প, পূরণ করে চলেছে পদ্ধতিগত জ্ঞানের অভাব। সন্ধিৎসু মনে শক্তি, সাহস আর আগ্রহের যে ঝড় সেদিন উঠেছিলো তার প্লাবন চলেছে অন্তরের অন্তঃস্থলে। স্থির করেছে লক্ষ্য, বাতলে দিয়েছে পন্থা, যোগান দিয়েছে বৌদ্ধিক সামর্থ্যের। হয়তো এটাই ছিল শুভকর পরিবর্তনের কাঙ্ক্ষিত সূচনা।
স্যারের আলোচনা এবং প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ থেকে তরুন তাজউদ্দীনের বর্ণাঢ্য ইতিহাসের কিঞ্চিত যে ধারনাটুকু পেয়েছি তাতে এটা প্রণিধানযোগ্য যে, তাজউদ্দীনের নেতৃত্ব হুজুগেও নয়, আবার বংশানুক্রমিক কিংবা অর্পিতও নয়, সেটা অর্জিত। আমার মনে হয়, এই ব্যাপারটাই তাজউদ্দীন আহমদকে সবচেয়ে বেশী প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে আমার মতো হাজারো তরুনের মাঝে, যারা বংশানুক্রম, হুজুগ কিংবা অনুকম্পার নেতৃত্ব চায়না; বরং বঙ্গতাজের মতো সমাজকর্মের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বের গঠন, বিকাশ ও স্থায়িত্বে বিশ্বাসী।
একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কোন দিকে পরিচালিত হবে তা নির্ভর করে সেখানকার নেতৃত্বের গঠন প্রক্রিয়া ও গুণাবলীর উপর। গতানুগতিক ধারার বাইরে সমাজকর্মের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব গঠনের স্বপ্ন লালন করি বলেই আমার জীবনে বঙ্গতাজ হয়ে উঠেছেন এক কার্যকরী অনুসরণ। প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থসমূহের প্রতিটি বর্ণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অধ্যয়ন করে বঙ্গতাজের জীবন থেকে খুঁজে নিয়েছি নেতৃত্বের অসংখ্য গুণাবলী, তালিকাবদ্ধ করেছি ৫৭টি বিশেষ বৈশিষ্ট্য, আত্মস্থ ও ধাতস্থের সুবিধার্থে সেগুলোকে বিন্যস্ত করেছি ৩টি পর্যায়ে, আর ইতিমধ্যেই শুরু করেছি প্রথম পর্যায়ের অধ্যবসায়। তাজউদ্দীনের গল্পই আমাকে শিখিয়েছে পরিবেশের দোহাই না দিয়ে কীভাবে পরিবেশ তৈরির কাজে ব্রত হতে হয়। আমি অনুধাবন করেছি, সমাজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজে আত্মনিয়োগের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় চরিত্রের মেরুদণ্ড, শানিত হয় নেতৃত্ব, দৃঢ় হয় গণভিত্তি, সমৃদ্ধ হয় প্রজ্ঞা, অর্জিত হয় অভীষ্ট লক্ষ্য। আত্মগঠনের জন্য আত্মশুদ্ধি ও জ্ঞানার্জন, সমাজ গঠনের জন্য আহবান ও ঐক্যবদ্ধ সংগঠন, আর রাষ্ট্রগঠনের জন্য সংস্কার ও প্রয়োজনবোধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন বলেই বঙ্গতাজ হয়ে উঠেছেন ফ্রেমে বাঁধানো এই মানচিত্রের সুনিপুণ কারিগর। শেষোক্ত ‘যুদ্ধ’ বিষয়টি বাদ দিলে বাকীসব আজও প্রাসঙ্গিক, আপন মহিমায়।
আর এভাবেই পৃথিবীর উপর সূর্যের প্রভাবের মতোই বিস্তৃত হয়ে আছে আমার জীবনে বঙ্গতাজের প্রভাব। তাঁর স্মরণে গড়ে তুলেছি Center for Tajuddin Ahmad Research & Activism (CTARA) নামে একটি অলাভজনক জনকল্যাণমুখী সংগঠন। বঙ্গতাজের জীবন, স্বপ্ন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা করা, চর্চা করা এবং জনকল্যাণে সেগুলোর প্রচার, প্রসার, প্রয়োগ ও সফল বাস্তবায়নই এই সংগঠনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এন টি ভি, আর টি ভিসহ বেশ কিছু মিডিয়ায় সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনের আওতায় ইতিমধ্যে আয়োজিত হয়েছে বেশ কিছু সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান, বক্তব্য ও রচনা প্রতিযোগিতা, পরিচ্ছন্নতাসহ বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ড; বঙ্গতাজের ‘ধর্মগোলা’ ধারণার আলোকে তৈরি হয়েছে সমাজকল্যাণ তহবিল, সচ্ছলদের অর্থাংশ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে অসচ্ছল শিশুদের জন্য শিক্ষা প্রকল্প, নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিবন্ধী ও ছিন্নমূল শিশুদেরকে দেয়া হচ্ছে বিনামূল্যে শিক্ষা ও শিক্ষা-উপকরণ; মানবহিতৈষী কিছু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে সর্বসাধারণকে দেয়া হচ্ছে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, শীতার্ত দুস্থের সেবায় সরবরাহ করা হয়েছে কম্বলসহ শীতবস্ত্র; শিশুদের মাঝে সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক বিকাশের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে একাধিক সাংস্কৃতিক প্রকল্প, ইতিমধ্যে বঙ্গতাজ-কন্যা শারমিন আহমদ এর রচনা ও প্রযোজনায় ১৭জন গ্রামীণ শিশু-কিশোরের অংশগ্রহণে সফলভাবে নির্মিত ও প্রদর্শিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম স্কুলভিত্তিক মূকনাটক ‘হৃদয়ে রঙধনু’; নিরাপদ খাদ্যের জন্য নির্মিত হচ্ছে ‘নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন কেন্দ্র’; শিশু-কিশোরদের মাঝে নাগরিক সচেতনতা ও নেতৃত্বের গুণাবলী সৃষ্টির জন্য আয়োজিত হচ্ছে মাসিক কর্মশালা, ট্রাফিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গাজীপুর জেলা পুলিশের সহায়তায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে ট্রাফিক শিক্ষা কর্মসূচী; ইউনাইটেড নেশন্স-ম্যাণ্ডেটেড ইউনিভার্সিটি ফর পিছ এর সম্মানিত ইমেরিটাস প্রফেসর ও ইন্টারন্যাশনাল পিছ স্কলার ড. আমর আব্দাল্লাহ’র সরাসরি পরিচালনায় একাধিকবার অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজ-জীবনে দ্বন্দ্ব নিরসনের উপায়’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালা। এছাড়াও শান্তিময় সমাজ গঠনের কাজে অংশগ্রহণের জন্য পরিচালনা করছি Working for The Implementation of Peace Education (WIPE) নামক একটি অলাভজনক সমাজসঙ্ঘ, শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের ক্ষমতায়নের জন্য গাজীপুর জেলাধীন টঙ্গীস্থ বনমালায় প্রতিষ্ঠা করেছি ‘রিপাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ’ নামে একটি অত্যাধুনিক মানবিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর আওতায় সবার জন্য কার্যকরী ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি ক্ষুদে উদ্যোক্তা গড়ে তোলা এবং তাদের সহযোগিতায় ‘আদর্শ গ্রাম’ ধারনাটা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেও কাজ করে যাচ্ছি,সর্বান্তকরণে। এসবকিছুই মূলত একই সূত্রে দীক্ষিতঃ তরুন তাজউদ্দীনের গল্প।
বঙ্গতাজের গল্প মানেই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি। মানবিকতায় ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিপ্লবী কোন নেতা কখনোই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যান না। মানবসমাজে তাঁর প্রভাব চিরন্তন। দুঃসময় আগ্রাসী হলেও সময় তাঁকে খুঁজে নেয় সময়ের প্রয়োজনে। শৈশবে কেবল বাবার মুখেই শুনেছি বঙ্গতাজের কথা। বার্ধক্যে বাবার অনুপস্থিতিতে বঙ্গতাজকে নিয়ে বলার কেউ নেই এমনটা না হয়ে দিক্বিদিক রণিত হোক বঙ্গতাজের নাম, অনুসৃত হোক তাঁর কর্ম ও আদর্শ; জয় হোক পরম সত্যের, সুন্দরের, মানবতার; সেই প্রত্যাশা নিয়ে তোমার বাংলায় আমরা সবাই ভালো আছি-বঙ্গতাজ! তুমি শান্তিতে থেকো।
আফতাব
সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সমাজকর্মী, বাংলাদেশ
ই-মেইলঃ aftab.du.bd@gmail.com